‘অন্য দশটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যদি জিপিএ–৫ পেতে পারে, ভালো ফল করতে পারে, আমি কেন পারব না? আমি কেন কৃষক বাবা ও গৃহিণী মায়ের মুখ উজ্জ্বল করতে পারব না? এই জেদ থেকে আমি পড়ালেখায় মনোযোগ দিই। যদিও আমার বাবার পক্ষে পড়ালেখার খরচ জোগানো ততটা সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত সফলতা এসেছে। আমি জিপিএ–৫ পেয়েছি।’ মঙ্গলবার সকালে নোয়াখালী জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ কৃতী সংবর্ধনায় উপস্থিত হয়ে এভাবেই নিজের সাফল্যের গল্প শোনায় সুবর্ণচর উপজেলার চর কাজী মোখলেস উচ্চবিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান লাবনী।
বৃষ্টিভেজা মনোরম আবহাওয়ায় সকাল থেকেই কৃতী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। প্রথম আলোর ফটোকার্ডে ছবি তোলা ও এক্সপেরিয়েন্স জোনের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা পুরস্কার জেতে এবং উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে। পরে সকাল ১০টায় মিলনায়তনে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সেখানে মুঠোফোনের আলো জ্বালিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে শিক্ষার্থীরা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গোলাম রব্বানী। নিজের জীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও প্রত্যন্ত গ্রামের একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছিলাম। স্কুলেরই এক বড় ভাইকে দেখে আমার তখন স্বপ্ন ছিল, আমি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। আমি আমার সেই স্বপ্ন লালন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছি এবং আজ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে তোমাদের সামনে কথা বলতে পারছি।’ একই সঙ্গে স্মার্টফোনের অপব্যবহার নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘পড়ালেখার প্রয়োজন ছাড়া স্মার্টফোন ব্যবহার করা যাবে না। আমি আমার সন্তান যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, তখন তাকে স্মার্টফোন কিনে দিয়েছি। তাই আমি বলব, এ বিষয়ে অভিভাবকেরা একটু সচেতন থাকতে হবে, আমার ফোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার যাতে নিজের সন্তানদের বিপথে ঠেলে না দেয়।’
অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর হেড অব ফার্স্ট নিউজ টিপু সুলতান বলেন, ‘সামনে তোমাদের উচ্চমাধ্যমিক, নতুন পড়াশোনা, নতুন চ্যালেঞ্জ। আজকের সাফল্য তোমাদের সাহস জোগাবে। সেখানেও জিপিএ–৫ পেতে হবে। তবে জিপিএ–৫ জীবনের সবকিছু নয়। তাই কখনো প্রত্যাশামতো ফল না হলে ভেঙে পড়বে না। একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে জীবনের সব সম্ভাবনা মাপা যায় না। ভুল থেকে শিখে আবার চেষ্টা করার শক্তিটা ধরে রেখো।’ শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলি অর্জনের পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা, ভালো মানুষ হতে হবে। যে পেশাতেই যাও, এমন মানুষ হও, যাকে অন্যরা বিশ্বাস করতে পারে; বিপদে যার কাছে সাহায্য চাইতে পারে। সে জন্য পাঠ্যবইয়ের বাইরেও পড়তে হবে। সাহিত্য পড়বে, বিজ্ঞান জানবে, সংবাদপত্র পড়বে। প্রথম আলো, কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তা তোমাদের সঙ্গী হতে পারে।’
পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা, মুখস্থবিদ্যা ও কিশোর গ্যাং পরিহারের শপথ পড়ান টিপু সুলতান। তিনি বলেন, ‘মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে না বলতে হবে। পাশাপাশি কিশোর গ্যাংকেও না বলতে হবে। কিশোর গ্যাং থেকে সাবধান, অসম বন্ধুত্ব থেকে সতর্ক থেকো। অভিভাবকদের কেউ বলব, সন্তান কাদের সঙ্গে মেশে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন। তোমরা বড় স্বপ্ন দেখো। সেই স্বপ্নে নিজের পরিবারের পাশাপাশি দেশের মানুষেরও জায়গা থাকুক। পৃথিবীর যেখানেই যাও, বাংলাদেশকে মনে রেখো।’
প্রথম আলো নোয়াখালীর নিজস্ব প্রতিবেদক মাহবুবুর রহমানের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এ আয়োজনে আরও বক্তব্য দেন নোবিপ্রবির ব্যবসা প্রশাসন অনুষদের ডিন আব্দুল কাইয়ুম মাসুদ এবং জাতীয় ক্রীড়াপুরস্কারপ্রাপ্ত ক্রীড়াবিদ রফিক উল্লা আক্তার মিলন। প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্য আসিফ আহমেদ, সানি তানজিদ ও আফরিনা ইসলামের সঞ্চালনায় জেলার বিভিন্ন স্কুলের আট শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়। অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন মিহানুর রহমান এবং সংগীত পরিবেশন করেন স্বস্তিকা দাশ। দ্বিতীয় পর্বে গান গেয়ে শোনান কণ্ঠশিল্পী অনীক সূত্রধর। শেষে অনলাইন কুইজে বিজয়ী ১০ শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা।