নির্বাচনে জয়ের পর স্ত্রীর সঙ্গে মিশিগানের নবনির্বাচিত সিনেটর আবদুল আল–সাইদ। ৪ নভেম্বর ২০২৬, মিশিগান
ইরানের বর্তমান প্রশাসনকে উচ্ছেদের প্রত্যয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দফায় দফায় বোমাবর্ষণ চালিয়েছেন। ‘সব বোমার মা’ নিক্ষেপের হুঁশিয়ারির পাশাপাশি সেখানে প্রায় দশ হাজার অবকাঠামো চূর্ণবিচূর্ণ করা হয়েছে এবং প্রাণ গেছে সহস্রাধিক নিরীহ নাগরিকের। তা সত্ত্বেও বিগত আট মাস ধরে তেহরানের শাসনক্ষমতা অপরিবর্তিত রয়েছে। অথচ কোনো ধরনের অস্ত্রের মহড়া কিংবা প্রাণহানি ছাড়াই গত মঙ্গলবার ভোটের মাধ্যমে খোদ ওয়াশিংটনের রাজনীতিতেই এক বিরাট পটপরিবর্তন ঘটিয়েছেন মার্কিন ভোটাররা। ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউস থেকে সরাসরি পদচ্যুত না করা হলেও কংগ্রেসের উভয় কক্ষের কতৃত্ব ছিনিয়ে নিয়ে তাঁর নিরঙ্কুশ আধিপত্যে লাগাম টেনেছেন তাঁরা। ব্যালটে নিজের নাম না থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প এটিকে নিজের ওপর গণভোট হিসেবে নেওয়ার যে আহ্বান সমর্থকদের জানিয়েছিলেন, নাগরিকরা যেন ঠিক সেই সুযোগটিই কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প ও তাঁর কট্টর মতাদর্শের বিরুদ্ধে গণরায় দিয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে এই ফল সাধারণ কোনো জয় নয়, বরং রীতিমতো এক ‘নীল সুনামি’।
মার্কিন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে বরাবরই চলতি রাষ্ট্রপ্রধানের মেয়াদের ওপর একটি গণভোট হিসেবে দেখা হয়। বিগত শতবর্ষের ইতিহাসে মাত্র তিনবার ছাড়া ক্ষমতাসীন দলকে সবসময়ই এমন ভরাডুবির শিকার হতে হয়েছে, যেমনটা ২০১০ সালে বারাক ওবামার শাসনামলের প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচনে ঘটেছিল যখন তাঁর দল হারিয়েছিল ৬৩টি আসন। এবার বেসরকারি প্রাথমিক তথ্যমতে, আইনসভার উভয় কক্ষের নেতৃত্ব ডেমোক্র্যাটদের অধীনে ফিরেছে। সিনেটে রিপাবলিকানদের হাত থেকে অন্তত ৭টি আসন কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি টেক্সাস, জর্জিয়া ও ওহাইওর মতো অতি রক্ষণশীল রাজ্যে গভর্নর পদে জয় নিশ্চিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। বিশেষ করে টেক্সাসে, যেখানে মাত্র দুই বছর আগেই ট্রাম্প দুই অঙ্কের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন, সেখানে এমন উলটপুরাণ ডেমোক্র্যাটদের গণজোয়ারকেই তুলে ধরে। ক্ষমতা ধরে রাখতে রিপাবলিকানরা আসন পুনর্বিন্যাস, জালিয়াতির অভিযোগ তুলে বিচার বিভাগীয় তদন্ত, ভোটার তালিকা থেকে অভিবাসী অপসারণ, সহস্রাধিক ফেডারেল পরিদর্শক নিয়োগ এবং সমর্থকদের কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার বন্দোবস্ত করেছিল। এমনকি জরুরি অবস্থা ঘোষণার ফন্দির কথা শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ জনতার রায়কে ঠেকানো যায়নি।
রিপাবলিকানদের এই পরাজয়ের মূলে ছিল শোচনীয় অর্থনৈতিক দশা। ১৯৯২ সালে বিল ক্লিনটনের প্রচার কর্মকর্তা জেমস কারভিলের সেই প্রখ্যাত মন্তব্য ‘ইটস দ্য ইকোনমি, স্টুপিড’ এবারও সত্য প্রমাণিত হয়েছে। নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও তেলের চড়া দামই ভোটারদের প্রধান বিবেচ্য ছিল। বার্তা সংস্থা এপির এক জনমত জরিপে উঠে এসেছে, ট্রাম্পের নীতিমালার কারণেই নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর জ্বালানির রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি পুরো বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে, যার প্রেক্ষিতে স্বয়ং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্বীকার করেছেন, ‘আমাদের হারের কারণ যুদ্ধ।’ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বাছবিচারহীন আমদানি শুল্কের খড়্গ, যা থেকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার আয়’ করার ট্রাম্পের দাবি মূলত সাধারণ মার্কিন ক্রেতাদের পকেট কাটারই নামান্তর ছিল। অথচ মূল্যস্ফীতিকে ডেমোক্র্যাটদের রটানো ‘হোক্স’ বা প্রতারণা আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প ভোটের আগের সপ্তাহেও জ্বালানি সংকটকে খাটো করে দেখেছিলেন এবং মন্তব্য করেছিলেন যে পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংসের জন্য এই ত্যাগ সামান্য এবং জ্বালানির বাড়তি দামে ‘আমরা দারুণ লাভবান হয়েছি’—যেখানে ‘আমরা’ বলতে কেবল তিনি, তাঁর পরিবার এবং ধনিক শ্রেণিকে বোঝানো হয়েছিল।
অর্থনীতির পাশাপাশি ট্রাম্পের বিভাজন ও বিদ্বেষের রাজনীতির বিরুদ্ধেও কঠোর রায় এসেছে। অভিবাসী ও বাদামি রঙের মানুষদের শ্বেতাঙ্গ সভ্যতার জন্য হুমকি এবং জেডি ভ্যান্সের ভাষায় ‘সভ্যতাগত নিশ্চিহ্নকরণ’ বা ‘সিভিলাইজেশনাল ইরেজার’ আখ্যা দিয়ে যে প্রচার চালানো হয়েছিল, তা বুমেরাং হয়েছে। ২০২৪ সালে মেক্সিকো সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর হয়ে ট্রাম্প সুবিধা পেলেও পরবর্তীতে সামরিক ধাঁচে শহরগুলোতে মুখোশধারী আইস সদস্যদের দিয়ে ধরপাকড় চালানো হয়। সন্তানদের সামনে পিতা-মাতাকে শিকল পরিয়ে নির্বাসনে পাঠানো এবং অভিযানে একাধিক মার্কিন নাগরিক নিহতের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ভোটাররা। ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে সমর্থনকারী টেক্সাস ও অ্যারিজোনার মেক্সিকান-আমেরিকানরা এবার উল্টো ভোট দিয়েছেন। এর ফলে টেক্সাসে দীর্ঘ চার দশক পর একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন, গভর্নর হয়েছেন এক হিস্পানিক নারী এবং রাজ্যটির আইনসভাও হাতছাড়া হয়েছে রিপাবলিকানদের।
কট্টরপন্থীদের প্রতিরোধের মুখে ইতিহাস গড়েছেন মিশিগানের নতুন সিনেটর আবদুল আল–সাইদ। ৪ নভেম্বর ২০২৬ মিশিগানে জয় নিশ্চিত হওয়ার পর ট্রাম্পের অতীত বিষোদ্গারের কড়া জবাব দেন তিনি। ট্রাম্প তাঁকে সন্ত্রাসী ও জিহাদি তকমা দিয়েছিলেন এবং গাজায় গণহত্যার সমালোচক হওয়ায় তাঁকে পরাজিত করতে কাড়ি কাড়ি ডলার ঢালা হয়েছিল; এমনকি সিনেটে প্রবেশে মেটাল ডিটেক্টর বসানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে আল-সাইদ এসব ফাঁদে পা না দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ও জনকল্যাণমূলক ইস্যুকে সামনে রেখে জয় ছিনিয়ে আনেন। নির্বাচনের পর ভ্যান্সকে খোঁচা দিয়ে তিনি বলেন, ‘হাবিবি, এখন তো আমাকে সিনেটর হিসেবে শপথ করাতে তুমি বাধ্য, সেটা তোমার শাসনতান্ত্রিক দায়িত্ব।’ এদিকে ৩ নভেম্বর ২০২৬ ওয়াশিংটনে ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসনাল ক্যাম্পেইন কমিটির (ডিসিসিসি) অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি পরিষদের নেতা হাকিম জেফ্রিস ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে কথা বলেন। ট্রাম্প নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন আইন তাঁর ওপর খাটে না এবং কেবল নিজস্ব নৈতিকতাই তাঁর একমাত্র প্রতিবন্ধক। তবে কংগ্রেসের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা ট্রাম্পের যুদ্ধ, বাণিজ্যনীতি ও তদন্ত প্রক্রিয়াকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখবে, যদিও জেফ্রিস স্পষ্ট করেছেন যে প্রতিশোধমূলক তদন্তের চেয়ে আমজনতার অর্থনৈতিক কষ্ট লাঘব করাই তাঁদের মূল এজেন্ডা।
ট্রাম্প শিবিরের এই পতনের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন শতকোটিপতি ইলন মাস্কও। ডেমোক্র্যাটরা জিতলে দেশটির ধ্বংস অনিবার্য দাবি করে রিপাবলিকানদের জয়ী করতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঢেলেছিলেন। স্থানীয় জনগণের মত ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিপক্ষে ডেমোক্র্যাটদের স্পষ্ট অবস্থান থাকায় এবং ডেটা সেন্টারের মূল কেন্দ্র টেক্সাস তাঁদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় চরম বেকায়দায় পড়েছেন এই ধনকুবের। নির্বাচনী ফলাফলে ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে মাস্ক আক্ষেপের সুরে বলেছেন, ‘আমাকে তাহলে মঙ্গল গ্রহে গিয়েই ডেটা সেন্টার নির্মাণ করতে হবে।’
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।