advertisement
advertisement

উপকূলের অস্তিত্ব রক্ষায় চকরিয়া সুন্দরবনের পুনরুজ্জীবন জরুরি


আলজাজিরা নিউজ বিডি -"রক্ত চক্ষুর চাহনি? সে তো ক্ষণিকের ধোঁয়া,সত্যের শিখা জ্বলে ওঠে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ" | প্রতিবেদক: Md. Zahangir Hasan প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১:২০ অপরাহ্ণ
উপকূলের অস্তিত্ব রক্ষায় চকরিয়া সুন্দরবনের পুনরুজ্জীবন জরুরি

কক্সবাজারের চকরিয়া সুন্দরবনের বদরখালী চ্যানেলে পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো হয়েছিল বাইন প্রজাতির গাছ। বেড়ে ওঠা এসব বাইনগাছ চকরিয়া সুন্দরবনের প্রাণ ফেরাতে আশা জাগাচ্ছে।

advertisement

আশির দশকে অনিয়ন্ত্রিত চিংড়ি চাষের প্রসারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন চকরিয়া সুন্দরবন। কক্সবাজারের ডুলাহাজারা ও বদরখালীজুড়ে বিস্তৃত এই প্রাচীন শ্বাসমূলীয় বন উজাড়ের পেছনে আবাসন ছাড়াও বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউএনডিপি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বাণিজ্যিক স্বার্থ ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি নোবেলজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের মৎস্য চাষ প্রকল্পের ১০ একর জায়গায় গড়ে ওঠা ৩০টি প্লটও সেখানে আজও বিদ্যমান। ১৯৫০-এর দশকে ২১ হাজার ১০২ একর আয়তনের এই বনের ১৮ হাজার ৫০৮ একর জমি সংরক্ষিত এবং বাকি অংশ রক্ষিত বন হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। অথচ বর্তমানে সেখানে টিকে রয়েছে কেবল একটিমাত্র সুন্দরীগাছ, যা নিয়ে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই ‘যে বনে একটিমাত্র গাছ’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল দৈনিক প্রথম আলো। ১৯৭৭ সালে বনাঞ্চলটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর পর ১৯৮৫ সালে তৎকালীন এরশাদ সরকারের চিংড়ি চাষ নীতিমালার মাধ্যমে এই ধ্বংসযজ্ঞ চূড়ান্ত রূপ নেয়।

বনটি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে চলতি বছরের ২৮ মার্চ চকরিয়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে প্রথম আলোর আয়োজনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, বনবিদ্যার শিক্ষক, গবেষক, পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনার প্রেক্ষাপটে একটি ক্রোড়পত্রও প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ২১ সেপ্টেম্বর ‘চকরিয়া সুন্দরবনে প্রাণ ফেরার আশা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বদরখালী চ্যানেলে একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে ২৫ একর জমিতে রোপণ করা ৮০ হাজার বাইনগাছ সফলভাবে টিকে রয়েছে এবং চলতি বছরের জুনে আরও ২৫ একর ভূমিতে ৪০ হাজার বাইনগাছের চারা লাগানো হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইজারা সত্ত্বেও বন বিভাগের নামে ৪ হাজার একর জমি রেকর্ডভুক্ত আছে এবং মৎস্য, কৃষি ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনির্ধারিত সীমানার সুযোগে দখল হওয়া এসব জমি উদ্ধার করাই তাঁদের প্রাথমিক লক্ষ্য।

পরিবেশবিদদের মতে, বনের বাস্তুতন্ত্র না ভেঙে ‘সিলভোফিশারি’ বা ম্যানগ্রোভভিত্তিক সমন্বিত চিংড়ি চাষের মাধ্যমে প্রকৃতি ও বাণিজ্য উভয়ই রক্ষা করা সম্ভব। ১০ সেপ্টেম্বর প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা জানান, বৈশ্বিক উষ্ণতায় সনাতন পদ্ধতিতে চিংড়ির মৃত্যুহার ৬৪ শতাংশ হলেও পাইকগাছায় ১০০ হেক্টর জমিতে পরীক্ষিত ম্যানগ্রোভ পদ্ধতিতে তা নেমে এসেছে ৫০ শতাংশে। বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী এই কৌশল প্রাকৃতিক বনের বাইরে চকরিয়ার মতো স্থানে প্রয়োগের পক্ষে মত দেন। ১৯২৬ সালে গবেষক জেমস কোওয়ানের ‘দ্য ফ্লোরা অব চকরিয়া সুন্দরবনস’ অনুযায়ী, এখানে ৫৩ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং বাঘ, হরিণসহ বহু বন্য প্রাণী ও মাছের বিচরণ ছিল। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বনটি না থাকায় কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম উপকূলে যে বিপুল প্রাণহানি হয়েছিল, উপযুক্ত বনভূমি থাকলে তা বহুলাংশে কমানো যেত।

বিজ্ঞানীদের মতে, উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ প্রতি হেক্টরে অন্তত ১৫০ মেগা টন কার্বন সঞ্চয় করতে সক্ষম; সেই হিসাবে চকরিয়া সুন্দরবনের প্রায় ৮ হাজার ৪৯৮ হেক্টর এলাকা ১২ লাখ ৭৪ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন কার্বন সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত। তবে বনটি পুনরুদ্ধারে ইজারাদারদের অসহযোগিতা, পোল্ডার ও ঘেরের বাঁধের ফলে জোয়ার-ভাটার ব্যাঘাত, মাটির লবণাক্ততা এবং পানির প্রবাহ পরিবর্তনের মতো বড় বাধা রয়েছে। এছাড়া ২০১৮ সালে টেকসই উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য প্রকল্পের মাধ্যমে ১৪টি জেলায় বিশ্বব্যাংকের নতুন বিনিয়োগ (ডেইলি স্টার, ১৪ জুলাই ২০২৬) এবং মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পোর্ট অ্যাকসেস সড়ক নির্মাণের মতো মহেশখালীর ব্যাপক শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাস্তুতন্ত্রের যথাযথ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা গেলে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার মতো চকরিয়ার এই ৩০ বর্গকিলোমিটার উপকূলীয় বনকেও পুনরায় বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর